Sunday, October 20, 2024

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) এবং এর সুবিধা ও অসুবিধাসমূহ

 

জাতীয় আইনসভার  নিম্ন (বা একমাত্র) কক্ষে নির্বাচন করতে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবহার করে দেশগুলির তালিকা

সারা বিশ্বে জাতীয় নির্বাচনের জন্য নানবিধ নির্বাচনী পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। প্রতিনিধিত্বশীল গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে বর্তমানে ব্যবহৃত নির্বাচনী ব্যবস্থাগুলি দু’টি মূল ধরণের মধ্যে বিভক্ত করা যেতে পারে, তা হলো: (১) সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব (Majoritarian Represntation) ও (২) সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation)। কোনো দেশ কর্তৃক গৃহীত নির্বাচনী ব্যবস্থা সম্ভবত বিভিন্ন ভোটদান পদ্ধতির আপেক্ষিক গুণাগুণ সম্পর্কে কোনও বিমূর্ত বিবেচনার চেয়ে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপর বেশি নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রিটিশ রাজনৈতিক ঐতিহ্যযুক্ত দেশগুলি সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব (Majoritarian Representation) ব্যবস্থায় বেশি ঝুঁকছে, অন্যদিকে মহাদেশীয় ইউরোপের দেশগুলি সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) ব্যবস্থার দিকে বেশি ঝুঁকছে।

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation)

নির্বাচনী ব্যবস্থার দ্বিতীয় প্রধান শ্রেণিটি সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা হিসেবে পরিচিত। ভোটের অনুপাতে আসন বণ্টন করার জন্য সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে, এই আশায় যে আইনসভা ও সরকারে ভোটারদের পছন্দের সঠিকভাবে প্রতিফলিত করবে। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা এখন পশ্চিমা গণতন্ত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নির্বাচনী ব্যবস্থা। জন স্টুয়ার্ট মিল, লেকী ও রামসে মুর প্রমুখ সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সমর্থক।

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হলো একটি গণতান্ত্রিক নীতি যা ভোটারদের প্রদত্ত ভোটের অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে। এর অর্থ সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব একটি আইনসভায় একটি দলের আসন সংখ্যা সেই দলের প্রাপ্ত ভোটের শতাংশের প্রতিফলন ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি নির্বাচনে কোনও দল ৩০% ভোট পায়, তবে এটি ১০০ সদস্য বিশিষ্ট আইনসভায় ৩০ জন সদস্যকে আইনসভায় প্রেরণ করবে। সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায়, একটি নির্বাচনী জেলায় রাজনৈতিক দলগুলি যে পরিমাণ ভোট পায় তার সমান অনুপাতে আইনসভায় আসন বরাদ্দ করা হয়। এই ব্যবস্থাটি বহু সদস্যের জেলাগুলির (multi-member districts) উপর নির্ভর করে। বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, গ্রীস, হাঙ্গেরি, ইজরাইল, ইতালি, লুক্সেমবার্গ, নরওয়ে, রাশিয়া, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ডসহ অনেক দেশে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে।

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার দুটি মূল ধরণ রয়েছে, তা হলো: (ক) দলীয় তালিকা ব্যবস্থা (Party List Systems) এবং (খ) একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট পদ্ধতি (Single Transferable Vote System)।

(ক) দলীয় তালিকা ব্যবস্থা (Party List Systems)

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির একটি হলো দলীয় তালিকা ব্যবস্থা। দলীয় তালিকা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব হলো এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা যেখানে ভোট ভাগের ভিত্তিতে দলগুলিতে প্রথমে আসন বরাদ্দ করা হয় এবং তারপরে দলগুলির নির্বাচনী তালিকায় দল-অনুমোদিত প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এই ব্যবস্থা ফিনল্যান্ড, লাটভিয়া, সুইডেন, ইসরাইল, ব্রাাজিল, নেপাল, নেদারল্যান্ডস, রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র অফ কঙ্গো ও ইউক্রেন সহ অনেক দেশে দলীয় তালিকা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে।

দলীয় তালিকা ব্যবস্থা অনুযায়ী একটি নির্বাচনী জেলার ভোটাররা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দ্বারা মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচন করে। যখন ভোট গণনা করা হয়, প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার তালিকা থেকে সদস্য সংখ্যা নির্ধারণের অধিকারী; যা তার জনপ্রিয় ভোটের অংশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনও দল ৩০% ভোট পায়, তবে এটি ১০ প্রার্থীর তালিকা হতে ৩ জন সদস্যকে আইনসভায় প্রেরণ করবে।

কোনো কোনো রাষ্ট্রে কোটারি পার্টির উত্থানকে নিরুৎসাহিত করার জন্য, এই ব্যবস্থায় আসন লাভের যোগ্যতার জন্য দলগুলিকে অবশ্যই কমপক্ষে ন্যূনতম ভোট পেতে হয়। ন্যূনতম ভোট সংখ্যা স্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। ইসরাইলের দলসমূহকে নেসেটে আসন লাভের যোগ্যতা অর্জনের জন্য জনপ্রিয় ভোটের ন্যূনতম ১%  পেতে হয়। অন্যদিকে, জার্মানিতে দলসমূহকে অবশ্যই জাতীয় ভোটের ন্যূনতম ৫% জিতে বা তিনটি একক-সদস্য নির্বাচনকেন্দ্রের আসন লাভ করে আনুপাতিক ভিত্তিতে আসন লাভের যোগ্যতা অর্জন করে।

দলীয় তালিকা ব্যবস্থায় দলগুলি নির্বাচনের জন্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করে এবং দলটি প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যার অনুপাতে প্রতিটি দলকে আসন বিতরণ করে। আলবেনিয়া, আর্জেন্টিনা, তুরস্ক ও ইজরাইল প্রভৃতি রাষ্ট্রে ভোটাররা সরাসরি দলের পক্ষে ভোট দিতে পারেন; অথবা ফিনল্যান্ড, ব্রাজিল ও নেদারল্যান্ডসের মতো রাষ্ট্রে প্রার্থীদের প্রাপ্ত ভোট পার্টির মোট ভোটের সাথে যুক্ত হবে। 

(খ) একক হস্তান্তরযোগ্য ভোট পদ্ধতি (Single Transferable Vote System)

একক স্থানান্তরযোগ্য ভোট ব্যবস্থা হলো একটি ভোটিং পদ্ধতি যা বিশ্বের অনেক দেশে একটি আইনসভা বা পরিষদে একাধিক প্রতিনিধি নির্বাচন করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এটি একটি অগ্রাধিকারমূলক ভোট ব্যবস্থা, যার অর্থ ভোটাররা পছন্দের ক্রম অনুসারে প্রার্থীদের র্যাঙ্ক করে। এ পদ্ধতিতে নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভোটের একটি কোটা দেয়। যে প্রার্থীরা কোটায় পৌঁছান তারা অবিলম্বে নির্বাচিত হন, এবং তারা যে অতিরিক্ত ভোট পান তা ভোটারদের দ্বিতীয় পছন্দের ভিত্তিতে অন্য প্রার্থীদের কাছে স্থানান্তরিত হয়।

প্রথম রাউন্ডে কোনো প্রার্থী কোটায় না পৌঁছালে, সবচেয়ে কম ভোট পাওয়া প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয় এবং তাদের ভোট তাদের ভোটারদের পরবর্তী পছন্দের ভিত্তিতে বাকি প্রার্থীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সমস্ত আসন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত বা শুধুমাত্র অবশিষ্ট প্রার্থীরা কোটায় না পৌঁছানো পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে।

একক স্থানান্তরযোগ্য ভোট প্রয়োগ জটিল ও বিভ্রান্তিকর হতে পারে, বিশেষ করে যদি প্রার্থীর সংখ্যা বেশি হয়। ভোট গণনাও সময়সাপেক্ষ হতে পারে এবং এর জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ প্রয়োজন। এসব চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও, এই ব্যবস্থা আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া ও মাল্টাসহ অনেক দেশে সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এটি প্রতিনিধি নির্বাচনের একটি ন্যায্য ও কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের সুবিধা: সমানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার বেশ কিছু সুবিধা রয়েছে। সমানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার সুবিধাসমূহ নিম্নরূপ:

১. ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা ন্যায়ানুগ কারণ এতে সকল দল প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়। এ ব্যবস্থায় সকল ভোট গণনা করা হয় এবং নির্বাচনে প্রতিটি ভোটের সমান ওজন থাকে। এ ব্যবস্থায় ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের আসন জয়ের আরও ভাল সুযোগ রয়েছে। এটি ভোটারদের মতামতের বৈচিত্র্যকে প্রতিফলিত করে এবং সব রাজনৈতিক দলের জন্য ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে।

২. ভোটারদের উপস্থিতি বাড়ায়: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা ভোটারদের অধিক প্রার্থী হতে নিজেদের পছন্দসই প্রার্থী বাঁছাই করার সুযোগ প্রদান করে। এর ফলে ভোটদানে ভোটারদের আগ্রহ বাড়ে এবং তাদের অধিক উপস্থিতি নিশ্চিত হয়। ভোটারদের প্রতিটি ভোটই ফলাফলে প্রভাবিত করতে পারে। ভোটাররা যখন দেখেন যে তাদের ভোটের প্রভাব আছে, তখন তাদের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

৩. উন্নত প্রতিনিধিত্ব: এ ব্যবস্থায় ভোটারগণ প্রার্থী নির্বাচনে অধিক প্রার্থী হতে নিজেদের পছন্দ প্রয়োগের সুযোগ পায়। এ ব্যাপারে তাদের সতর্কতার ফলে ভালো ভালো প্রার্থী নির্বাচিত হয়। এ প্রক্রিয়ায় সংখ্যালঘু দল ও তাদের ভোটারদের বক্তব্য নিশ্চিত করা হয়। এই ব্যবস্থা আইনসভায় বৈচিত্র্যময় কণ্ঠস্বরের উপস্থিতি নিশ্চিত করে, যারা বহুধারণা ও মতামতের বিস্তৃত পরিসরের প্রতিনিধিত্ব করে। 

৪. জোট গঠনকে উৎসাহিত করে: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য জোট গঠন করতে উৎসাহিত করে। এটি রাজনৈতিক দলসমূহকে বৃহত্তর সহযোগিতার দিকে পরিচালিত করে। অধিকতর ঐকমত্য-ভিত্তিক নীতি-নির্ধারণ নিশ্চিত করে সরকারকে স্থিতিশীল করে।

৫. জবাবদিহিতা বাড়ায়: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব জবাবদিহিতা বাড়াতে পারে। কেননা তাদের জোটগত কাজ করতে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনে সমর্থন বজায় রাখার জন্য জবাবদিহিমূলক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক দলসমূহ কাজ করে। এটি একটি আরো সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল সরকার নিশ্চিত করতে পারে।

৬. সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব আইনসভায় সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্বকে উৎসাহিত করে। এটি আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি নিশ্চিত করে মানুষের বিস্তৃত পরিসরের সমস্যা সমাধান করে। এ ব্যবস্থায় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয় বিধায় সংখ্যালঘুরা সন্তুষ্ট থাকে।

৭. সামাজিক পরিবর্তনের ভালো প্রতিফলন: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তনশীল মতামতকে আরও ভালোভাবে প্রতিফলিত করতে পারে। এ ব্যবস্থায় সংখ্যালঘু দলসমূহ প্রভাবশালী ভূমিকা রাখতে পারে এবং প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

৮. জেরিম্যান্ডারিং হ্রাস করে: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব জেরিম্যান্ডারিংয়ের প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে, যা নির্বাচনী সীমানাকে হেরফের করে একপক্ষকে অন্যপক্ষ থেকে বেশি সুবিধা দেয়। সমানুপাতিক ব্যবস্থায় নির্বাচনী সীমানা কম গুরুত্বপূর্ণ কেননা এতে দলসমূহ নির্দিষ্ট আসনের জন্য লড়াই করছে না।

৯. বৃহত্তর বৈচিত্র্য: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সরকারে বৃহত্তর বৈচিত্র্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে, কারণ ছোট দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা আসন জিততে পারে। এর ফলে সরকারে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও ধারণা নিয়ে আসতে পারে। এটি আরও গতিশীল ও উদ্ভাবনী রাজনৈতিক পরিবেশের নিশ্চিত করতে পারে।

১০. মেরুকরণ কমায়: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলসমূহকে অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনের জন্য জোট গঠন করে সরকারে মেরুকরণ কমাতে উৎসাহিত করা হয়। এর ফলে আরো স্থিতিশীল ও কার্যকর সরকার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

১১. রাজনৈতিক শিক্ষা: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি ভোটারদের রাজনৈতিক শিক্ষা প্রদান করে। এ প্রক্রিয়ায় ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকে বিধায় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণের অধিক জ্ঞান থাকে। এতে মেধাবী, জনপ্রিয় ও বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ নির্বাচিত হওয়ায় জনগণের রাজনৈতিক শিক্ষা সহজ হয়। 

১২. ভোটের অপচয় রোধ: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় ভোট নষ্ট হয় না। কেননা ভোট গণনায় প্রতিটি ভোটেরই গুরুত্ব রয়েছে। লর্ড অ্যাকটন বলেন, "It is profoundly democratic for it increases the influence of thousands who would otherwise have no choice in the government and it brings men more near an equality by so contriving that no vote shall be wasted of his own."

১৩. দুর্নীতি হ্রাস: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও অর্থের অপচয় কম হয়। কারণ কোন দলই এতে প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। এটি রাজনৈতিক দলসমূহের কর্পোরেশন ও ধনী দাতাদের কাছ থেকে বড় অনুদানের উপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে।

উপসংহারে বলা যায় যে, সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব অন্যান্য নির্বাচনী ব্যবস্থার তুলনায় বেশ কিছু সুবিধা প্রদান করে। স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সরকারকে নিশ্চিত করতে এ ব্যবস্থা সহায়ক ।

সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের অসুবিধা: সমানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার বেশ কিছু অসুবিধা রয়েছে। সমানুপাতিক নির্বাচনী ব্যবস্থার অসুবিধাসমূহ নিম্নরূপ:

১. জটিল ভোটব্যবস্থা: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব একটি জটিল ও বিভ্রান্তিকর ভোটদান পদ্ধতি হওয়ায় কিছু ভোটারকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখতে পারে। এছাড়াও একক হস্তান্তরিত ভোট ব্যবস্থায় ভোট গণনায় ভীষণ অসুবিধা হয়। 

২. অস্থিতিশীল সরকার: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করা কঠিন করে তুলতে পারে, কারণ প্রায়ই সরকার গঠনে জোট করার প্রয়োজন হয়। এর ফলে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ঘন ঘন নির্বাচন প্রয়োজন হতে পারে।

৩. প্রতিনিধিত্বের অভাব: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব সকল নাগরিকের জন্য প্রতিনিধিত্ব নাও দিতে পারে, কারণ ছোট দল বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কার্যকর প্রচারণা চালানোর জন্য সম্পদ বা সমর্থন নাও থাকতে পারে। এর ফলে সরকারে বৈচিত্র্যের অভাব দেখা দিতে পারে।

৪. জবাবদিহিতার অভাব: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় জনপ্রতিনিধিরা দায়িত্বশীল হয় না। কারণ নির্বাচনী এলাকা বৃহৎ হওয়ায় জনগণের সাথে জনপ্রতিনিধিদের যোগাযোগ বিরল। এ পদ্ধতিতে আসন বণ্টন প্রতিটি দলের প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত দ্বারা নির্ধারিত হওয়ায় ভোটারদের পক্ষে পৃথক রাজনীতিবিদদের তাদের কর্মের জন্য দায়বদ্ধ রাখা কঠিন করে তুলতে পারে।

৫. শক্তিশালী সরকারের অভাব: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ফলে শক্তিশালী সরকারের অভাব দেখা দিতে পারে। কারণ এ ব্যবস্থায় গঠিত জোট বা সংখ্যালঘু সরকার কার্যকরভাবে নীতি বাস্তবায়ন করতে সক্ষম নাও হতে পারে। এতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। 

৬. আইন পাসে অসুবিধা: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব আইন পাস করা কঠিন করে তুলতে পারে, কারণ সমঝোতা ও ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে পারে। এতে উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্থ হতে পারে। এছাড়াও অনেক দলের প্রতিনিধিত্ব থাকায় প্রত্যেকে নিজেদের সুবিধামতো আইন প্রণয়নের চেষ্টা করে। ফলে জনকল্যাণকর আইন প্রণয়নে সম্ভবপর হয় না।

৭. সংসদীয় ব্যবস্থার অনুপযোগী: সংসদীয় ব্যবস্থার জন্য এটা উপযোগী নয়। কারণ এতে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গোষ্ঠী প্রতিনিধিত্ব লাভ করায় দ্বন্দ্ব সংঘাত সৃষ্টি হয়। অধ্যাপক ইসমেইন বলেন, "It renders cabinets unstable, destroy their homogeneity and make parliamentary government unstable."

৮. ছোট ছোট দলের আধিপত্য: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ফলে ছোট দলগুলির আধিপত্য দেখা দিতে পারে, কারণ তারা সরকারে অসম পরিমাণ প্রতিনিধিত্ব অর্জন করতে পারে। এটি বৃহত্তর দলগুলির প্রতিনিধিত্ব হ্রাস করতে এবং বৃহত্তর ভোটারদের স্বার্থের অভাব ঘটাতে পারে। 

৯. চরমপন্থী দলকে উৎসাহ: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব চরমপন্থী দল গঠনকে উৎসাহিত করতে পারে, কারণ তারা তুলনামূলকভাবে অল্প শতাংশ ভোটের মাধ্যমে সরকারে প্রতিনিধিত্ব পেতে পারে। এটি মধ্যপন্থার অভাব এবং একটি মেরুকৃত রাজনৈতিক আবহাওয়ার দিকে নিয়ে যেতে পারে।

১০. আঞ্চলিক বা জাতিগত সংঘাত: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ফলে আঞ্চলিক বা জাতিগত সংঘাত হতে পারে, কারণ দলগুলি বৃহত্তর ভোটারদের স্বার্থের পরিবর্তে তাদের নির্দিষ্ট স্বার্থের দিকে মনোনিবেশ করতে পারে। এতে জাতীয় ঐক্যের অভাব এবং সরকারের সহযোগিতার অভাব দেখা দিতে পারে।

১১. উপনির্বাচনের অনুপস্থিতি: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা নেই। উপনির্বাচন সংসদীয় ব্যবস্থায় অতীব গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক ফাইনার বলেন, " By-elections indicate the political trend but this type of election is not possible in proportional representations." 

১২. ভৌগোলিক প্রতিনিধিত্বের অভাব: সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ফলে ভৌগোলিক প্রতিনিধিত্বের অভাব দেখা দিতে পারে, কারণ দলগুলি দেশের সমস্ত এলাকার জন্য প্রতিনিধিত্ব প্রদানের পরিবর্তে এমন এলাকায় তাদের প্রচেষ্টাকে কেন্দ্রীভূত করতে পারে যেখানে তাদের ভোট জয়ের সম্ভাবনা বেশি।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটা সন্দেহাতীত নয়। অধ্যাপক লাস্কি বলেন, " The problem of modern state could not be solved by a reform of electoral machinery." তবুও সমানুপাতিক ভোট পদ্ধতি সংখ্যালঘিষ্ঠদের প্রতিনিধিত্বের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। তবে এটা অত্যন্ত জটিল। এক্ষেত্রে ভোটারদের অতি সচেতন ও শিক্ষিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

No comments:

Post a Comment

আজ ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিক নাকি কলেজ প্রতিষ্ঠাতার জন্মদিন?

কলেজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিক তারিখ নিয়ে মতদ্বৈততা রয়েছে। কলেজ প্রতিষ্ঠাবার্ষিক তারিখ নিয়ে দুটি মত পাওয়া যায়। একটি হলো ২৪ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৯ সাল এবং অ...